অন্যরকম ইশকুলের গল্প!

cc0ccd3d5_83.jpg

সিঙ্গাপুরে্র একদম অন্যরকম একটা ইসকুলের গল্প শোনাই। গল্পটা আমাকে ভীষণ নাড়া দিয়েছে।

সেরাদের দেশ সিঙ্গাপুর, কিন্তু তা হলে হেরো’রা যায় কোথায়? তাদের জন্যে আছে আশ্চর্য এক ইসকুল, যেখানে লুকোনো ক্যামেরায় ধরা হয় শুধুই ভালোর ছবি।
শাস্তি নেই, আছে শুধু সম্মান আর আদর।

ক্লাসের সব ডেস্কের থেকে দূরে, আলাদা করে রাখা একটা ডেস্ক। এমন জায়গায়, যেখানে বসলে ক্লাসের অন্য ছেলেমেয়েদের সঙ্গে চোখাচোখি হওয়ারই সুযোগ নেই, কথা বলার সুযোগ দূরস্থান। স্কুলের প্রিন্সিপাল ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন সেই ক্লাসঘর। জানতে চাইলাম, নিশ্চয়ই খুব দুষ্টু ছেলেদের জন্য এই ব্যবস্থা? মধ্য চল্লিশের ভদ্রমহিলা হাসলেন। বললেন, এই স্কুলের সবাই তো দুষ্টু ছেলে। এই চেয়ারটা তাদের জন্য, যাদের বাড়িতে আজ কোনও একটা অশান্তি হয়েছে। সেই অশান্তির জন্য তার মন খারাপ। স্কুলে এসে এই চেয়ারে বসে পড়লেই অন্যরা বুঝতে পারে, তার আজ মন খারাপ। টিচাররাও বুঝতে পারেন। যে এই চেয়ারে এসে বসে, তাকে সবাই সেদিনের জন্য ছেড়ে দেয়। তার সঙ্গে কেউ ঝগড়া করে না, পড়া ধরে না।
মন খারাপের চেয়ার। সিঙ্গাপুরের নর্থ লাইট স্কুলে প্রথম পরিচয় হল এই চেয়ারটার সঙ্গেই। এশিয়ার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আমরা ১৪ জন সাংবাদিক সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলাম, সেখানকার এক সরকারি সংস্থার দেওয়া এশিয়া জার্নালিজম ফেলোশিপে। আয়োজকরা গোটা দেশ ঘুরিয়ে দেখাচ্ছিলেন আমাদের। দেশ মানে শুধু শহরটাই। ওইটুকুই দেশ। বছর ষাটেক আগেও শান্ত, অলস একটা মফস্সল ছিল সিঙ্গাপুর, জেলেদের বসতি। স্বাধীনতার পর হঠাৎই ঘুম ভেঙে উঠল যেন, চড়চড় করে উন্নতি, ভোল বদলে শহরটা হয়ে উঠল দুনিয়ার আধুনিকতম শহরগুলোর একটা। এখন গোটা দুনিয়ার ব্যাঙ্কের সদর দফতর এই শহরে, এখানকার চাঙ্গি এয়ারপোর্ট বিশ্বের ব্যস্ততম বিমানবন্দরের তালিকায় পড়ে। আর, এই মহাকাশযানের গতিতে উন্নতি করতে গেলে একটা শর্ত অপরিহার্য, এই শহরে শুধু সফলদেরই দাম। সে দাম অনেক, কিন্তু শুধু তাদের জন্য, যারা বাকিদের হারিয়ে দৌড়ে এক নম্বর হতে পারে। যারা সে দৌড়ে হেরে যায়, তারা হেরেই যায়। সেই হেরোদের কী হল, তা নিয়ে ভাবার সময় এই শহরের নেই। মনও কি আছে?
সেই দেশের একটা স্কুলে মন খারাপের চেয়ার? প্রথমে অবাক লাগে। তার পর এই স্কুলের গল্প শুনি। এই স্কুলটা হেরোদেরই স্কুল। এই নর্থ লাইট স্কুলে ভর্তি হওয়ার একটাই শর্ত অন্য কোনও স্কুলে দু’বার ফেল করতেই হবে! আর, সেই স্কুলের প্রিন্সিপালের থেকে লিখিয়ে আনতে হবে, এই ছেলেটার, বা মেয়েটার কিছু হওয়ার কোনও আশা নেই। ব্যস, এই অবস্থায় পৌঁছতে পারলেই হল নর্থ লাইট স্কুলের দরজা খোলা।

সেই খোলা দরজা দিয়ে কারা ঢুকে পড়ে এই স্কুলের মধ্যে? তারাই, যাদের প্রায়ই মন খারাপ করে স্কুলে আসতে হয়। মন খারাপের কারণ অনেক। হয়তো বাবা নেশার তাড়নায় স্কুলের মাইনে খরচ করে ফেলেছে, অথবা মা আর বাবার মধ্যে তুমুল মারপিট হয়েছে কাল রাতে, অথবা দাদাকে পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়েছে ড্রাগ অ্যাবিউজের অভিযোগে। এই ছেলেমেয়েগুলো সিঙ্গাপুরের হেরে যাওয়া দুনিয়ার সন্তান। এদের মা-বাবা কেউ কোনও দৌড়ে জিততে পারেনি। তাই তারা এক কামরার ফ্ল্যাটে পাঁচ জন গাদাগাদি করে থাকে। সেই ঘরেই মারপিট দেখে, ঝগড়া দেখে, হয়তো কখনও কখনও ঘুমের ভান করে চোখের কোণ দিয়ে আদরও দেখে। যে দিন রাতের খাবার কেনার পয়সা থাকে না, সে দিন শুধু জল খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে। তাই সকালে উঠে এদের মন খারাপ হয়। স্বাভাবিক। যে দিন সেই মন খারাপের খুব বাড়াবাড়ি হয়, সে দিন ক্লাসঘরে আলাদা করে রাখা চেয়ারে এসে বসে পড়ে তারা। সে দিন তার সঙ্গে কেউ ঝগড়া করে না, কেউ পড়া ধরে না। সিঙ্গাপুর দেশটা আশ্চর্য। সেখানে প্রতি রাস্তায়, প্রতি মোড়ে, প্রত্যেক অফিসে-স্কুলে-মেট্রো স্টেশনে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা বসানো। সারাক্ষণ প্রশাসনের চোখ নজর রাখে সবার ওপর। সামান্যতম বেচালও ধরা পড়তে বাধ্য। আর তার শাস্তিও মারাত্মক। আমরা তখনও সিঙ্গাপুরেই এক দিন কাগজে পড়লাম, সরকারি সম্পত্তির ওপর রং লেপে দেওয়ার শাস্তি হয়েছে এক জনের। পনেরো ঘা চাবুক! আঁতকে উঠবেন না। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার মতো কয়েকটি দেশে চাবুক বা বেত্রাঘাত বেশ প্রচলিত শাস্তি। আর এই শাস্তির আদেশ দেয় আদালতই।
নর্থ লাইট স্কুলেও ক্যামেরা বসানো আছে। প্রত্যেক ক্লাসঘরে, প্রতিটি সিঁড়িতে। সেই ক্যামেরা রেকর্ড করে চলেছে ছাত্রদের সব চালচলন। কিন্তু, এই স্কুলের নিয়ম আলাদা। এখানে ছাত্রদের খারাপ আচরণগুলোকে পাত্তা দেওয়া হয় না। বেছে নেওয়া হয় শুধু ভাল আচরণগুলো। আর তার জন্য পুরস্কারেরও ব্যবস্থা আছে। প্রতিটি ক্যামেরার তলায় টাঙানো বোর্ডে লেখা আছে, ‘এই ক্যামেরায় তোমাদের সব ভাল জিনিস রেকর্ড হয়ে থাকছে’। যে ছেলেমেয়েগুলো বাড়িতে শুধু অভাব দেখে, হিংস্রতা দেখে, ঝগড়া দেখে তারা এই ক্যামেরার সামনে এসে কেমন করে যেন বদলে যেতে থাকে। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরেই যে ছেলেটা রেগে গিয়ে কাচের জানালা ভেঙে দিয়েছিল, সেই ছেলেটাই নিজের রুমাল বার করে মুছে দেয় দেওয়ালে লেগে থাকা দাগ। খারাপ আচরণের জন্য শাস্তি হয় না, অথচ ভাল আচরণের জন্য সবার সামনে প্রশংসা পাওয়া যায় এই বোধটা যখন মনে বসে যায়, তখনই ভিতর থেকে বদলে যেতে থাকে তারা। এক জন নয়, সবাই। সব্বাই। তার পর ক্যামেরা থাক আর না-ই থাক, সেই ভাল আচরণগুলো সঙ্গে থেকে যায়। হয়তো আজীবন থাকবেও।
স্কুলের প্রিন্সিপাল একটা গল্প বলছিলেন। তাঁর ছেলের গল্প। তখন ছেলের বয়েস তেরো। সে পড়াশোনায় ভাল, শহরের নামী স্কুলে পড়ে। সচ্ছল পরিবারের এই বয়সের ছেলেরা যেমন হয়, সে-ও একেবারেই সে রকম। মায়ের স্কুলের কোনও একটা বিশেষ দিনে মায়ের সঙ্গে এসেছিল সে, দেখবে বলে। স্কুলের অনুষ্ঠান উপলক্ষে স্থানীয় এক বেকারি কিছু উপহার পাঠিয়েছিল। সামান্য উপহার কাপ কেক। ছাত্রছাত্রীদের জন্য। একটা টেবিলের ওপর কয়েকটা রেকাবিতে রাখা ছিল সেই কেকগুলো। ছেলেমেয়েরা লাইন করে এসে সেই রেকাবি থেকে কেক তুলে নিচ্ছিল, প্রত্যেকে একটা করে। প্রিন্সিপালের ছেলে দাঁড়িয়েছিল সেখানেই, কিন্তু সে মোটেই ভালবাসে না ওই সাধারণ কেক। ফলে, সে নেয়নি। সে দাঁড়িয়ে দেখছিল। এমন সময় তারই বয়সী একটা ছেলে এগিয়ে গেল প্রিন্সিপালের দিকে। জিজ্ঞেস করল, সে কি একটার বদলে দুটো কেক নিতে পারে? প্রিন্সিপাল জিজ্ঞেস করলেন, কেন? ছেলেটি বলল, তার দাদা এই কেক খেতে খুব ভালবাসে। সে দাদার জন্য একটা কেক নিয়ে যেতে চায়। প্রিন্সিপাল বললেন, সবার নেওয়া হয়ে গেলে যদি অবশিষ্ট থাকে, তবে সে অবশ্যই নিতে পারে। ছেলেটি শান্ত ভাবে দাঁড়িয়ে থাকল। সবার নেওয়া হয়ে গেলে সে আর একটা কেক তুলে যত্ন করে ব্যাগে ভরে রাখল। একটাই। অনেকগুলো পড়ে ছিল যদিও।

প্রিন্সিপালের ছেলে বাড়ি যাওয়ার পথে পুরো রাস্তা কেঁদেছিল। তার পর সে আর কোনও দিন কোনও খাবার খেতে আপত্তি করেনি।
আমরা স্কুল দেখতে থাকি। ঘুরতে ঘুরতে পৌঁছে যাই একটা ঘরে খেলার ঘর। সেখানে মস্ত বিলিয়ার্ড বোর্ড, টেবিল টেনিস বোর্ড। দারুণ। আমাদের পোড়া কলকাতায় তো প্রশ্নই নেই, সিঙ্গাপুরেও খুব বেশি স্কুলে অমন বোর্ড আছে বলে মনে হল না। সবই ছাত্রছাত্রীদের খেলার জন্য। তবে সব ছাত্রছাত্রীর জন্য নয়। যাদের কাছে পয়েন্ট আছে, শুধু তারাই খেলতে পারে। সেই পয়েন্ট পাওয়া যায় ভাল হয়ে থাকলে। ভাল আচরণ ক্যামেরায় রেকর্ড হলেও পয়েন্ট, টিচাররা প্রশংসা করলেও পয়েন্ট। সেই পয়েন্টের টোকেন পাওয়া যায়। পয়েন্ট জমিয়ে জমিয়ে একটা বোর্ড খেলার মতো অবস্থায় এলেই খেলতে চলে আসে ছেলেমেয়েরা। আসল গল্প অবশ্য সেটা নয়। এই ঘরে কোনও নজরদার নেই, কোনও ক্যামেরাও নেই। যথেষ্ট পয়েন্ট না থাকলেও খেলতেই পারে কেউ, যদি তার ইচ্ছে করে। কিন্তু, কেউ খেলে না। সবাই পয়েন্ট জমা পর্যন্ত অপেক্ষা করে। অবাক হলাম। তার পর মনে হল, বিশ্বাসের এই এক গুণ। যদি কাউকে সত্যিই বিশ্বাস করা হয়, সে প্রাণপণ চেষ্টা করে সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রাখতে। আর, এই ছেলেমেয়েগুলো যে পরিবেশ থেকে আসে, যে পরিবার থেকে আসে, সেখানে বিশ্বাসের কোনও গল্প নেই। সেখানে একে অপরকে অবিশ্বাস করাই দস্তুর। সেখান থেকে এসে হয়তো প্রথমে এই বিশ্বাসের আলোহাওয়া অলীক লাগে, তার পর তারা নিজেরাই বুঝতে পারে, না চাইতেই কী দুর্মূল্য সম্পদ তাদের কাছে এসেছে। তাকে প্রাণপণ রক্ষা করার কথা তখন তাদের বলে দিতে হয় না।
আমরা স্কুলের বাগান দেখতে যাই। এই বাগানেরও একটা গল্প আছে। স্কুলের পিছনে খানিকটা জমি পড়ে ছিল। এমনিই। এক দিন ছাত্রছাত্রীরা এসে প্রিন্সিপালকে বলে, তারা সেই জমিতে গাছ লাগাতে চায়। প্রিন্সিপাল এক কথায় নাকচ করে দেন এই আবদার। পাগল নাকি! স্কুলের পিছনে শেষে আগাছার জঙ্গল হবে! ছেলেমেয়েরা হাল ছাড়ে না। তারা ঘুরেফিরে একই দাবি জানাতে থাকে। তারা যেখানে থাকে, সেখানে এক ফোঁটাও জমি নেই। একচিলতে বারান্দাতেও সংসারের জিনিস ঠাসা। তারা গাছ লাগাবে কোথায়? শেষ পর্যন্ত প্রিন্সিপাল রাজি হন। একটাই শর্ত, মাঝপথে বাগানের দায়িত্ব ছেড়ে দিলে চলবে না। ছেলেমেয়েরা প্রবল উৎসাহে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সেই জমিতে একটা একটা চারা ক্রমে বড় হয়ে উঠতে থাকে। কুমড়ো, পেঁপে, শসা থেকে ফুলকপি সবই ফলে সেই বাগানে। সেই ফসল বিক্রি হয়, সেই টাকা স্কুলের তহবিলেই দিয়ে দেয় ছেলেমেয়েরা। স্কুল শেষ হওয়ার পরেও তারা বাড়ি যেতে চায় না। বাগানে নিজেদের গাছের কাছে যায়। তার কতটা বাগানের টানে, আর কতটা বাড়ি ফেরার সময়টাকে যত দূর সম্ভব পিছিয়ে দেওয়ার জন্য, কে জানে! তারা তো দুই পৃথিবীর বাসিন্দা। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরলেই আবার সেই ঝগড়াঝাটি, অশান্তির দুনিয়া ছোটরাও তো পালানোর পথ খোঁজে।
ছেলেমেয়েদের গল্প বলেন প্রিন্সিপাল, আর আমরা দেখতে পাই, তাঁর চোখে ক্রমশ জমে উঠছে মায়া। এই ছেলেমেয়েগুলোর জন্য মায়া, যারা নিজেদের বাড়ির, পরিবারের না-পাওয়াগুলোকে খানিকক্ষণের জন্য সরিয়ে রাখতে স্কুলে আসে প্রতি দিন। শরীর খারাপ নিয়েও আসে। তারা স্কুল কামাই করতে চায় না পারতপক্ষে। কী পায় তারা এই স্কুলে? শুধু একটা খেলার ঘর, একটা বাগান? পড়াশোনায় ভুলের জন্য তেমন কঠিন শাস্তি না পাওয়ার আশ্বাস? নাকি তার চেয়েও বেশি কিছু? একটা মমতার আস্তরণ, তাদের না-পাওয়া, তাদের সংকটগুলোকে বুঝতে পারার মতো কয়েক জন শিক্ষক? তাদের হেরো বলে দেগে না দেওয়ার প্রতিশ্রুতি? হেরে যাওয়া লড়াই জিততে সব রকমের সাহায্যের বাড়িয়ে দেওয়া হাত? জিজ্ঞেস করে ফেলি। প্রিন্সিপাল বলেন, এই ছেলেমেয়েগুলোর জন্য সবচেয়ে বেশি জরুরি কী জানেন? তাঁদের এই বিশ্বাসটুকু দেওয়া যে তারা অন্য কারও চেয়ে একটুও কম যায় না। তারা কোনও লড়াই এখনও হেরে যায়নি। সবাই তো লেখাপড়ায় ভাল হয় না। আর, এই স্কুলে আসার জন্য পর পর দু’বার ফেল করতেই হয়! কাজেই, এখানে যারা আসে, তারা কেউই পড়াশোনায় ভাল না। আমরা তাই পড়াশোনাতেই সব জোর দিই না। এখানে হাতের কাজ শেখাই। কেউ ইলেকট্রিশিয়ান হওয়ার কোর্সে ভর্তি হয়, কেউ হোটেল ম্যানেজমেন্ট শেখে, কেউ বিউটিশিয়ান কোর্স করে। তারা শিখেও ফেলে চটপট। নিজেরাও অবাক হয়। আর, সবচেয়ে বেশি যেটা হয়, ওদের মধ্যে নিজের প্রতি বিশ্বাস তৈরি হয়ে যায়। ছোটবেলা থেকে যে দুনিয়াটা ওদের ঘাড়ে চেপে বসেছে, তার থেকে যে বেরিয়ে আসা সম্ভব ওরা বুঝতে পারে। আমাদের কাজ, এই বিশ্বাসটুকু তৈরি করে দেওয়া।

কথা বলতে বলতেই চোখে পড়ে, স্কুলের দেওয়াল জুড়ে মস্ত এক পোস্টার অন্ধকার আকাশ, আর তাতে ঝলমল করছে কয়েকটা তারা। নীচে লেখা, অন্ধকার যত গাঢ় হবে, তুমিও ততই উজ্জ্বল হয়ে উঠবে। সত্যিই তো, নর্থ লাইট মানে ধ্রুবতারা। অন্ধকার আকাশে যে আলো নাবিকদের কখনও পথ হারাতে দেয়নি। এই ছেলেমেয়েগুলোও নিজেদের পথ খুঁজে নেয়। বিশ্বাসের পথ। স্কুলের নিয়ম, কোনও ছাত্র সিগারেট খেতে পারবে না। স্কুলের ভিতরে তো নয়ই, বাইরেও নয়। এক দিন স্কুলের কয়েকটি ছাত্র, স্কুল থেকে অনেক দূরে একটা পার্কে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল। স্কুলের এক শিক্ষিকার এক আত্মীয়ের চোখে পড়ে তারা। তিনি স্কুলের ইউনিফর্ম চিনতেন। তিনি সেই ছেলেগুলিকে কিছু বলেননি, কিন্তু তাঁর পরিচিত সেই শিক্ষিকাকে কথাটি জানান। পরের দিন স্কুলের অ্যাসেম্বলিতে দাঁড়িয়ে সেই শিক্ষিকা শুধু বলেন, তোমাদের মধ্যে কয়েক জন কাল লুকিয়ে সিগারেট খাচ্ছিলে। কারা, আমি জানি না। জানতেও চাই না। কিন্তু, তারা স্কুলের বিশ্বাস নষ্ট করেছ। তাঁর কথা শেষ হওয়ার পর মিনিট খানেকের স্তব্ধতা। তার পর এগিয়ে এল ছেলেগুলি। স্বীকার করে নিল নিজেদের দোষ। সবার সামনে। এই ছেলেগুলোকে আমি চিনি না, কিন্তু নিশ্চিত জানি, এরা কোনও দিন বিশ্বাসের পথ থেকে সরে আসবে না।
আমাদের স্কুলের অডিটোরিয়ামে নিয়ে যান প্রিন্সিপাল। সেখানে একটা ফিল্ম দেখানো হবে। স্কুলের অ্যানুয়াল ডে-র ছবি। অ্যানুয়াল ডে-তে এখানে অনেক তাঁবু খাটানো হয়। প্রত্যেক ছাত্রের জন্য একটা করে তাঁবু। তাদের বাবা-মা এসে থাকেন তাদের সঙ্গে। টানা দু’দিন। ছেলেমেয়েদের বন্ধুদের দেখেন, তাদের স্কুলের জীবন দেখেন। ফিল্ম চলে, আমরা দেখতে থাকি। একটা বছর বারোর মেয়ে স্টেজে উঠে গান গায়। তার বাবা-মা অবাক হয়ে দেখেন। তার পর স্কুলের এক শিক্ষিকা সেই মেয়েটির সব ভাল দিকগুলোর কথা বলেন, তার সমস্ত সাফল্যের কথা বলেন। সেই মেয়েটি নেমে যায়। তারই বয়সী একটি ছেলে স্টেজে ওঠে। সে-ও তার মা-বাবাকে অবাক করে দারুণ সিন্থেসাইজার বাজায়। তার পর তার সম্বন্ধেও বলতে থাকেন এক শিক্ষিকা।
এ ভাবেই চলতে থাকে। তার পর হঠাৎ অন্য দিকে ঘুরে যায় ক্যামেরা। প্রথম যে মেয়েটা স্টেজে উঠেছিল, তাকে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কাঁদছেন তার বাবা-মা। মেয়ে বাবার পিঠে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। কান্না থামলে বাবা বললেন, আমার মেয়ে যে এত ভাল, এত কিছু পারে, আমি জানতামই না। ওকে তো সময় দিইনি কখনও। শুধু কষ্টই দিয়েছি। আজ থেকে আর না। আমি আমার মেয়েকে নিয়ে খুব ভাল ভাবে বাঁচব।
ফিল্ম শেষ হয়। আমরাও ফিরে আসি। স্কুলের গেট পেরোতে পেরোতে মনে হয়, অনেকগুলো মানুষের জীবন পাল্টে দেওয়ার একটা চেষ্টা কি আমরাও করতে পারি না? কখনও?

{{বাংলা Quora থেকে নেয়া ‘সুশোভন চ্যাটার্জী’র লেখা}}

Share Now

Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on telegram
Share on whatsapp
Share on pocket
Share on email

Write a Comment